কৃষকের যে ভালবাসা পেয়েছি তা আমার জীবনে বিশাল প্রাপ্তি-এসএএও সোহেল রানা

0
101
কৃষকের যে ভালবাসা পেয়েছি তা আমার জীবনে বিশাল প্রাপ্তি

কৃষকের যে ভালবাসা পেয়েছি তা আমার জীবনে বিশাল প্রাপ্তি-এসএএও সোহেল রানা। সম্প্রতি বদলি জনিত কারণে ঈশ্বরগঞ্জে এক কৃষি উপ সহকারী কর্মকর্তাকে মাঠ পর্যায়ে বিপুল বিদায় সংবর্ধনা দিয়েছেন কৃষকরা। যা রীতিমতো ঈর্ষণীয়। একজন কৃষি উপসহকারি মাঠে কৃষকের পাশে থেকে কাজ করবেন এটাই স্বাভাবিক। আর সরকারি চাকরি বিধি মোতাবেক বদলি হওয়া এটাই নিয়ম।

কিন্তু ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের হারুয়া ব্লকে এসএএও সোহেল রানাকে বিদায় উপলক্ষে কৃষকরা ব্যাপক সংবর্ধনার বিষয়টি বিবেকবান মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে। দৃষ্টি কাড়ার কারণ হচ্ছে দীর্ঘ কাল থেকেই ব্লক সুপারভাইজার (বর্তমানে কৃষি উপ সহকারী কর্মকর্তা) তাদের বিরুদ্ধে কৃষকরা অভিযোগ করে থাকেন যে, কৃষকরা তাদের চিনেন না, মাঠে আসেন না ইত্যাদি। কিন্তু এ অভিযোগ ইদানিং ঢালাও ভাবে না হলেও একেবারে শূন্যের কোটায় আজও আসেনি।

কৃষি উপ সহকারী কর্মকর্তা সোহেল রানা বেলায় এ ধরনের অভিযোগ তো দূরের কথা তাঁর বদলি জনিত কারণে কৃষকরা বিদায় সংবর্ধনার মাঝে যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন তা সত্যিকার অর্থেই একটি বিরল দৃষ্টান্ত।

সোহেল রানা জানান, তিনি ২০১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ঈশ্বরগঞ্জে যোগদান করেন। তাঁর কর্ম এলাকা নির্ধারিত হয় হারুয়া ব্লক। যোগদানের পর থেকে নিষ্ঠার সাথে তিনি দায়িত্ব পালন করে কৃষকের মন জয় করে সকলের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।

চর শংকর গ্রামের কৃষক আব্দুল বাতেন মিয়া জানান, সোহেল স্যার খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তাকে ডাক দিলেই কাছে পেতাম। তিনি বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে আমাদেরকে সাহায্য করতেন। তিনি আমাদের ব্লকে সারাদিন কাজ করে সন্ধ্যায় লক্ষীগঞ্জ বাজারে ইউনিয়ন পরিষদে তার অফিসে কৃষকদের সাথে প্রায়ই চা আড্ডায় বসতেন। এতে স্যারের সাথে কৃষকদের হৃদয়ের এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এমনও দিন গেছে দিনে দুইবার এমনকি শুক্রবারেও মাঠে এসে কৃষক ও ফসলের খোঁজখবর নিতেন।

মাইজবাগ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আনোয়ার পারভেজ জানান, আমি তাঁর কাজে অনেক সন্তুষ্ট। আমার এলাকার কৃষকরা তাঁর কাছ থেকে সার্বক্ষণিক কৃষি পরামর্শ পেয়ে উপকৃত হয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদে কৃষি বিভাগের একটি কক্ষ বরাদ্দ রয়েছে। সেখানে তিনি নিয়মিত বসতেন এবং কক্ষটিকে তাঁর মত করে সাজিয়ে ছিলেন। এতে বুঝা যায় তিনি তাঁর পেশাগত কাজে কতটুকু দায়িত্ববান এবং রুচিশীল ছিলেন। কৃষি ও কৃষকবান্ধব অফিসারের বদলীতে আমার হারুয়া ব্লকের কৃষকরা বেদনাহত ও আবেগ প্রবণ হয়ে তাঁকে বিপুল সংবর্ধনার মাধ্যমে বিদায় জানিয়েছেন। এটা তাঁর প্রতি কৃষকদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

লক্ষীগঞ্জ বাজারের বিসিআইসি সার ডিলার রাজন জানান, সোহেল রানা ছিলেন সকলের প্রিয় একজন অফিসার। তিনি কৃষি সম্পর্কিত সকল সংগঠনের সাথে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে ছিলেন।

তার বিদায়লগ্নে ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ হারুয়া বিলপাড়া মহিলা পুষ্টি সমবায় সমিতি, সঙ্গবদ্ধ মাইজবাগ ইউনিয়ন সামাজিক সংগঠন, মাইজবাগ ইউনিয়ন পরিষদ, মাইজবাগ ইউপি ডিজিটাল সেন্টার, বিসিআইসি সার বীজ ও খুচরা সার ডিলার, হারুয়া সিআইজি পুরুষ ফসল সমবায় সমিতি, ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদনকারী সংগঠন, ভাসমান বেডে সবজি চাষি গ্রুপ ও স্কয়ার গ্রুপ কেয়ার লিমিটেড বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।

হারুয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, অনেক প্রান্তিক চাষী আছেন যারা সংবর্ধনার আয়োজন করতে পারেননি। তারা গ্রাম থেকে উপজেলায় ছুটে গেছেন দেখা করে ভুল ত্রুটির মার্জনা চাইতে।

নিজগাও গ্রামের কৃষক শান্ত মিয়া জানান, ২৯ আগস্ট সোহেল স্যারের সাথে আমরা ৮/১০ জন কৃষক দেখা করতে গেলে তিনি আমাদেরকে এক রেস্টুরেন্টে নিয়ে আপ্যায়নের আয়োজন করেন। এ সময় প্রান্তিক চাষী কুদরত আলী আপ্যায়নে আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, স্যার এমন আপ্যায়ন আমার জীবনে প্রথম। স্যার জীবনে দেখা হবে কিনা জানিনা। আপনার কাছে একটা দাবি, যাবার আগে আপনার একটি ছবি দিয়ে যাবেন। আপনার দেখা না পেলেও অন্তত আপনার ছবিটাতো দেখতে পারবো।

এব্যাপারে উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সোহেল রানা বলেন, বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। এ দেশের শতকরা ৮০ ভাগ মানুষের জীবিকা নির্বাহের উপায় হচ্ছে কৃষি। দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ সম্পূর্ন কৃষির উপর নির্ভরশীল। তাই কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি ও পরামর্শ প্রদান করে কৃষির উন্নতি সাধন করাই ছিল আমার লক্ষ্য। আমি আমার পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে কৃষক ভাইদের সর্বাত্মক সহযোগিতা পেয়েছি। মাঠে কর্মকালীন সময়ে কৃষক ভাইয়েরা যে আমাকে এত আপন করে নিয়েছে তা আমি আগে বুঝতে পারিনি। হারুয়া ব্লকের সর্বস্তরের কৃষকরা বিদায় সংবর্ধনার মাধ্যমে যে ভালবাসা সম্মান দেখিয়েছেন তা আমার জীবনে বিশাল প্রাপ্তি। এ সম্মান আমার আগামী কর্মময় জীবনে অনুপ্রেরণা যোগাবে।

এবিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাধন কুমার গুহ মজুমদার বলেন, এসএএও সোহেল রানা বয়সে তরুণ, কর্ম চঞ্চল, পেশাগত দায়িত্বের প্রতি ছিল খুবই আস্থাশীল। পেশার প্রতি অবিচল আস্থা থাকায় মাঠ পর্যায়ে কৃষকের হৃদয়ে স্থান করে নেয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছে। এটা তাঁর প্রশংসনীয় গুণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here