আলোকিত শিক্ষক ছিলেন আব্দুল খালেক স্যার

0
24
আলোকিত শিক্ষক ছিলেন আব্দুল খালেক স্যার

আলোকিত শিক্ষক ছিলেন আব্দুল খালেক স্যার।.যার নাম স্বরণ করলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। তিনি ১৯৫০ সালের ৩০শে নভেম্বর ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভার পাইভাকুরী গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম ইছব আলী এবং মাতার নাম মরহুমা বিবি সাবজান বেগম। পাড়াপাছাশী গ্রামের মিহির উদ্দিন মাষ্টার সাহেবের কাছে তাঁর শিক্ষায় হাতে খড়ি ঘটে। তিনি ছিলেন শিক্ষানুরাগী ও মানবিক শিক্ষক।

তিনি ১৯৬৬ সালে ঈশ্বরগঞ্জের চরনিখলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মানবিক শাখায় প্রথম বিভাগে গণিতে লেটার মার্কসহ এস এস সি পাস করেন। সে সময়ে গৌরিপুর কেন্দ্রে একজন ছাত্রই প্রথম বিভাগ পান তিনি হলেন আব্দুল খালেক স্যার।

১৯৭০ সালে কিশোরগঞ্জ সরকারি গুরুদয়াল কলেজ হতে দ্বিতীয় বিভাগে বিএসসি পাস করেন। ছাত্র জীবন থেকেই তার শিক্ষকতার প্রতি ঝোঁক ছিল। তিনি ১৯৭০ সনে সোহাগী ইউনিয়ন হাই স্কুলে তার প্রথম শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। তিনি ১৯৭৩ সনে ১৫ নভেম্বর ঈশ্বরগঞ্জ বিশ্বেশ্বরী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় বিএসসি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর তিনি ১৯৮৪ সালে গৌরীপুর আরকে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। শিক্ষকতার মধ্যেই তিনি ১৯৭৯ সালে প্রথম শ্রেণীতে বিএড এবং ১৯৯৬ সালে দ্বিতীয় শ্রেণীতে এমএড পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

ছাত্র জীবনে নিজ গ্রামে কোন বিদ্যালয় না থাকায় তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে নিজ গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে দরিদ্র মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিবেন। কর্মজীবনের শুরুতেই নিজ গ্রামে পাঁচটি বাড়িতে তার নিজ তত্ত্বাবধানে পাঁচটি নৈশ স্কুল চালু করেন। এতে পাইভাকুরী গ্রামের অনেক যুবক নিরক্ষরমুক্ত হয়েছিল।

১৯৭০ সনে নিজ গ্রামে ফুরকানিয়া ও হাফেজিয়া মাদ্রাসা স্থাপন করেন। গ্রামবাসীদের সাহায্যে উক্ত মাদ্রাসা এখন ধর্মীয় শিক্ষার আলো বিস্তার করছেন। তিনি ১৯৯০ সালে ১শ শতক নিজস্ব জমিতে তার পিতার নামে পাইভাকুড়ি ইছব আলী বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১৯৯৯ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে তিনি এবং তার স্ত্রীর নামে আব্দুল খালেক মাকসুদা উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপন করেন।

২০০৮ সালে এ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় প্রথমবার অংশগ্রহণকৃত ৯৫% ছাত্রছাত্রী কৃতকার্য হয়। স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রথমদিকে অনেক ছাত্রছাত্রী শিক্ষা সামগ্রী ও বই কিনতে না পারায় অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছিল। ঝড়ে পরার এ পরিস্থিতি দেখে তিনি খুব ব্যথিত হন। পরে তিনি তাঁর নিজস্ব অর্থ ও বিভিন্ন শুভাকাঙ্খির কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে বিদ্যালয়ের গরিব ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে শিক্ষা সামগ্রী ও বই প্রদান করেন। এছাড়াও তিনি সমাজকল্যাণ প্রতিষ্ঠান, রেড ক্রিসেন্ট প্রতিষ্ঠান, সমবায় সমিতিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত থেকে গ্রামের দুঃস্থ ও অসহায় মানুষের খেদমত করে গেছেন। তিনি ১৯৮০ সনে ঢাকা বোর্ডের গণিত পরীক্ষক হিসাবে কাজ করেছেন।

১৯৯৭-৯৮ এবং ২০০১-২০০২ এই চার বছর ঢাকা বোর্ডের গণিতের প্রধান পরীক্ষক হিসেবে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও ময়মনসিংহ অঞ্চলের জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় গণিতের পরীক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০০০-২০০৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক হিসেবে সুনামের সাথে কাজ করেন। একজন আদর্শ শিক্ষকের মধ্যে যে সকল গুণাবলী থাকার প্রয়োজন তার সবকিছু তাঁর মধ্যে ছিল। তাঁর প্রখর মেধা ও আদর্শ শিক্ষকতার স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯৮ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার আব্দুল খালেক স্যারকে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত করে স্বর্ণপদক প্রদান করেন।

ব্যক্তি জীবনে তিনি ছয় কন্যা এবং এক পুত্র সন্তানের জনক ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ব্যক্তি। আমাদের দেশের প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনকে আলোকিত করতে হলে আব্দুল খালেক স্যারের মত মেধাবী ও মানবিক শিক্ষকের বড়ই প্রয়োজন।

এই প্রজ্ঞাবান শিক্ষক ২০১৯ সালের ১১মার্চ ৭০ বছর বয়সে ঢাকা বিএসএইচ হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here