নাগরিক সমস্যা সমাধানে করণীয়-শেখ সায়মন পারভেজ

0
44
শেখ সায়মন পারভেজ হিমেল

নাগরিক সমস্যা সমাধানে করণীয়-শেখ সায়মন পারভেজ। “নাগরিক” শব্দটিকে কেন্দ্র করে অনেকগুলো শব্দ বা ক্ষেত্রের উৎপত্তি হয়েছে। যেমন এই নাগরিকের রাষ্ট্র প্রদত্ত মর্যাদাকে নাগরিকতা বলে। আবার নাগরিকতার ধারণা থেকেই পৌরনীতির উদ্ভব।কেননা ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ই এম হোয়াইট এর মতে, পৌরনীতি হল বিজ্ঞানের সেই মূল্যবান শাখা, যা নাগরিকের অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এবং স্থানীয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবতার সাথে জড়িত সকল বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে।

এতকিছু বলার উদ্দেশ্য এই যে,যদি একটি দেশের নাগরিকের মধ্যে তিনটি প্রধান গুণ – বুদ্ধি,বিবেক,আত্মসংযম না থাকে তাহলে আমরা ঐ দেশের নাগরিককে সুনাগরিক হিসেবে বিবেচনা করতে পারব না। তাহলে রাষ্ট্রকর্তৃক প্রদত্ত মর্যাদা গ্রহণ ও ব্যবহার উভয় ক্ষেত্রেই ঘাটতি পাওয়ায় স্বাভাবিক। যা নাগরিকতার কমতির প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রের পৌরনীতি নামক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নড়বড়ে রূপে প্রকাশ পায়। আর এটা মানতেই হবে যে, পৌরনীতিকে মজবুত করতে নাগরিকের কর্মদক্ষতা, স্বদেশপ্রেম, আত্মসচেতনতা বেশি জরুরি। আর এই নাগরিক মানে আমি, আমরা, সবাই অর্থাৎ একটি দেশে বসবাসকারী সমস্ত জনগণ।

অতএব ব্যক্তিগত সচেতনতাবোধ, দায়িত্বশীলতা ও স্বদেশপ্রেম একটি দেশের সমাজের নাগরিকতা নীতির মানদন্ড নিরূপণ করা হয় । নাগরিক সমস্যা আমাদের দেশে নতুন কোনো আলোচ্য বিষয় না। নাগরিক সমস্যাকে বিচার করলে দুইটি প্রসঙ্গ অবশ্যই আসবে। একটি হল জনগণ প্রসঙ্গ ,অপরটি রাষ্ট্র প্রসঙ্গ ।

জনগণের প্রসঙ্গে আসি। উদাহরণস্বরূপভাবে একটি নাগরিক সমস্যার কথা তুলে ধরি। যেমন জনসংখ্যার সমস্যা। রাষ্ট্রকর্তৃক নির্ধারিত রীতি একটি সন্তান বা দুটি সন্তান নেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ করা হলেও জনগণ এ বিষয়ে বেশ অনাগ্রহ।

এটা বলে রাখি , জনগণ মাত্রই নাগরিক। যখন নাগরিকের গুণাবলী সুষ্ঠুভাবে অর্জিত ও প্রয়োগ হয় তখন ওই নাগরিকদের সুনাগরিক বলে। আর এই সুনাগরিকের বসবাসকৃত সমাজকে সুশীল সমাজ বলে বিবেচনা করা হয় । যাই হোক, আমাদের দেশের নাগরিক সমস্যা তথা জনসংখ্যা সমস্যা বিষয়ে আলোকপাত করার আগে একটি পরিসংখ্যান দেখি।২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী,বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৯৩ লাখ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ১.৪৮ শতাংশ। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল ৮৭৬ জন।

আদমশুমারি ২০১১ অনুসারে জনসংখ্যা ১৪ কোটি ৯৭ লক্ষ ছিল( প্রায় ১৫কোটি)। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ১.৩৭ এবং প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ঘনত্ব ছিল ১০১৫ জন । অন্যদিকে আয়তনের দিক থেকে আমাদের দেশের অবস্থা নব্বইতম হলেও জনসংখ্যার দিক থেকে নবম। নাগরিক সমস্যা প্রসঙ্গে জনসংখ্যার ব্যাপারটা আনার উদ্দেশ্যে এটাই যে বাড়তি সংখ্যার কারণে নাগরিক সুবিধা প্রাপ্ত হওয়া অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।

মূলত নাগরিক সমস্যা সৃষ্টির উৎস হলো অতিরিক্ত জনসংখ্যা সমস্যা। আর এই অতিরিক্ত জনসংখ্যার সূত্রপাতটা শুরু হয় পরিবার কাঠামোতে। যেখানে পরিবারে অতিরিক্ত সদস্য সংখ্যার কারণে সদস্যদের ভরণপোষণ করতে পিতা যখন হিমশিম খায়, তখন মেয়েকে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্নটা আর থাকেনা বরং মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই মেয়ের গন্তব্য নির্ধারণ করা হয়। কেননা শুধুমাত্র পিতার ফোকাস থাকে ছেলে সন্তানের প্রতি। যার প্রেক্ষিতে পরিবার মেয়েদের অতি শিঘ্রই বাল্যবিয়ে দিয়ে দেয়।

আর এই বাল্যবিয়েটা একটা আদি নাগরিক সমস্যা। সোজা কথা,যে পরিবার অপ্রাপ্ত মেয়েকে বাল্যবিয়ে দিতে ও করাতে পারে ,সে পরিবার অতিশীঘ্রই নাতির মুখ দেখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করবে না, তার নিশ্চয়তা কি? আর অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েটি সন্তান জন্মদানের সময় মৃত্যুর সম্ভাবনা ঘটবে না, তার নিশ্চয়তা কি? অপুষ্টিতে ওই মা ও শিশুর জীবন বিপন্ন হবে না, এটার নিশ্চয়তা কি? এতগুলো অনিশ্চয়তার মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলছি, বাল্যবিয়ে হওয়া মাত্রই বাল্যবিয়ে হওয়া মেয়েটির প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা এখানেই সীমাবদ্ধ? অবশ্যই না। আমাদের বাল্যবিয়ে হওয়া মেয়েটির কথা ভাবতে হবে। তার অদূর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করতে হবে। তার মাঝে লুকায়িত স্বপ্নটা অনুভব করতে হবে। তার আগে একটু বাস্তবতার দিকে আসি। ক’দিন আগে করোনাকালীন দীর্ঘ ছুটির পর নব আমেজে নিয়ে যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হল,তখন বাংলাদেশের এমন কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেখানে বাল্যবিয়ে হওয়ার ঘটনাটি ঘটে নি।

এমনকি অনেকদিন আগে একটি পত্রিকায় দেখলাম কোনো বিদ্যালয়ে শুধুমাত্র একজন ছাত্রী উপস্থিত বাকি ছাত্রীদের সকলেরই বিয়ে হয়ে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনের অবহেলা ও ঘাটতি এক্ষেত্রে স্বীকার করতেই হবে।

বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উচিত ছিল প্রতিটি শিক্ষার্থীর, বিশেষ করে নবম দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের খোঁজ-খবর নেয়া আর স্থানীয় প্রশাসনের উচিত ছিল বাল্য বিয়ের ব্যাপারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাগিদ দেওয়ার পাশাপাশি নিজেরা আরো সক্রিয় হওয়া। আমাদের এটা মনে রাখতে হবে যে বাল্যবিবাহে মানে অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারণ করা স্বাভাবিক। যখন অপ্রাপ্ত মেয়েটি সন্তান ধারণ করবে তখন তার মৃত্যুর সম্ভাবনা কতটুকু, আমরা তো ভালো করেই জানি।

ধরে নিই, ভাগ্যবশত গর্ভবস্থা এই মেয়েটির মৃত্যু হলো না। তাহলে অপ্রাপ্ত কিশোরী গর্ভধারণ করার ফলে যে পুষ্টিহীনতা ও শারীরিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে, তা অস্বীকার কি করা যাবে? অবশ্যই না। অপরদিকে জন্ম নেওয়ার শিশুটির জীবন যে কতটা বিপন্ন হবে, তাতো আমরা নিশ্চিত।

এখন বাল্যবিবাহ বন্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারের ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে তদারকি করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে সেমিনার কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। স্বেচ্ছাসেবক কমিটি গঠন করা যেতে পারে। আরেকটা দিকে খেয়াল রাখতে যেন কোনো মেয়ের ইভটিজিংয়ের শিকার না হয়। কারণ অনেক সময় দেখা যায় যে যদি কোন মেয়েকে ইভটিজিং এর শিকার হলে দোষটা ওই মেয়ের কাছে এসে পড়ে। অবশেষে পিতা বাধ্য হয় মেয়েটাকে অন্য জায়গায় বিয়ে দিতে। এটাও ঐ মেয়ের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্নকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করে।

এই ব্যাপারে পরিবার, রাষ্ট্র, সমাজের বিশেষ তদারকি প্রয়োজন। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও সরকারের ভূমিকা পালন করতে হবে, নারীকে প্রতিষ্ঠিত করার মন মানসিকতা সৃষ্টিতে। নারীকেও আত্মসচেতন হতে হবে। আর পিতার দায়িত্বশীলতা বলতে এটা বুঝেছি না যে, তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে হবে। বিয়েটা হতে হবে বয়সের ভিত্তিতে নয়, বরং প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ভিত্তিতে, নারীর নিজ ইচ্ছা ও মতামতের ভিত্তিতে। বাল্যবিবাহ এর ব্যাপারে কাজীদেরই কেমন বা দুঃসাহস ।কোনরূপ জবাবদিহিতা ছাড়াই বাল্যবিবাহ পড়িয়ে ফেলে।

সরকারের উচিত কাজীদের এ ব্যাপারে কঠোর শাস্তির বিধান করা। কাজীদের যদি এই ব্যাপারে সতর্ক ও সচেতন করা হয় তাহলে বাল্যবিবাহ অনেকাংশে লাঘব করা সম্ভব। কাজী ও পুরোহিতদের এই ভুল যেন পুনরাবৃত্তি না হয় এজন্য আমাদের কঠোর সক্রিয় হতে হবে । আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় এমনকি শিক্ষিত মহলেও বাল্যবিবাহ হওয়া মেয়েটির ব্যাপারে এমন মনোভাব তৈরি হয়। যেমন বাল্যবিবাহ হওয়া মাত্রই মেয়েটির উপর আমাদের দায়বদ্ধতা এখানেই ইতি। এমন মনোভাব থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের মনোভাব এমন হতে হবে- বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করতে হবে এবং বাল্য বিয়ে হওয়া মেয়েটির যত্ন সরকার ও সমাজ কর্তৃক বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

সেই সাথে মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ওই কিশোরীর জীবন ও ভবিষ্যত অগোচরে অন্তরালে নষ্ট না হয় । করোনাকালীন সময় অনেক শিক্ষার্থী বাল্যবিবাহ হয়েছে, এক্ষেত্রে বাল্যবিয়ে হওয়া শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। বিয়ে হওয়া মানেই ওদের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়বদ্ধতা শেষ এমনটি কিন্তু নয়। এমনকি সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে দু’পক্ষের মাঝে বিশেষ চুক্তি করা যেতে পারে। যেমন এমন হতে পারে যে, মেয়েটির পড়াশোনা বন্ধ করা যাবে না।

এমনকি পড়াশোনা বন্ধ করার জন্য কোনো প্রকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করা যাবে না। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পূর্বে সন্তান নেয়া যাবেনা। মূলত চুক্তিটি এমনভাবে করতে হবে যেন ঐ মেয়েটির জীবন স্বপ্ন যেন অঙ্কুরেই বিনষ্ট না হয় ও মেয়েটির নিজ স্বাধীনতায় ইচ্ছামত পড়াশোনায় মনোযোগী হতে পারে। নাগরিক সমস্যা প্রসঙ্গে বাল্যবিয়েকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ, যখন বাল্যবিয়ে হবে তখন মা ও শিশুর জীবন বিপন্নের দিকে অগ্রসর হবে। আর শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। যখন আমাদের এই ভবিষ্যতরাই বাধাগ্রস্ত হবে তখন আমাদের দেশের অগ্রগতি উন্নতি সবকিছুই আস্তে আস্তে নিম্নগামী হবে। যাই হোক, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নাগরিক সমস্যা গুলো সমাধান হোক। এ প্রত্যাশা সকলের।

লেখক ও কলামিস্ট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here