তরুণ প্রজন্মের চোখে বিজয়: বিজয়ের বাহান্নে প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা

0
39
তরুণ প্রজন্মের চোখে বিজয়: বিজয়ের বাহান্নে প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা

তরুণ প্রজন্মের চোখে বিজয়: বিজয়ের বাহান্নে প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা। ডিসেম্বর মানে মহান ত্যাগে পরিপূর্ণ বিজয়ের উল্লাস। দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর চালানো পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড রুখে দিয়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ঝাঁপিয়ে পড়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে।

রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলে দীর্ঘ ৯ মাস। অতঃপর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ৩০ লাখ শহিদ ও ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলার ঘরে ঘরে জ্বলে ওঠে বিজয়ের মশাল। আলোর জ্যোতিতে আলোকিত হয় সমগ্র বাংলা, বাংলার মানুষ। বাঙালির শত বছরের শোষণের কালো ইতিহাসের পাণ্ডুলিপিতে যুক্ত হয় বিজয়ের নতুন মহাকাব্য। যে আলোর ঝলকানিতে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ মাত্র ৫২ বছরের মধ্যে পরিণত হয়েছে আধুনিক ও উন্নয়নশীল দেশে।

দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছিল এক মৃত্যুপুরীতে। পাকিস্তানি হায়নার ছোবলে ক্ষতবিক্ষত হয় শহর থেকে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল—প্রতিটি জায়গা। হায়েনাদের বিষাক্ত নখের আঁচড়ে জর্জরিত হয় বাংলার ঘরবাড়ি, মাঠঘাট, হাটবাজার, পথ-প্রান্তর সবকিছু। নরপশুদের সহযোগিতা করেছিল এ দেশেরই একদল বিশ্বাসঘাতক। তাদের বিশ্বাসঘাতকতার চোরাবালিতে পড়েই ১৪ই ডিসেম্বর বাংলার ইতিহাসে রচিত হয় কালো অধ্যায়।

বাংলার দামাল ছেলেদের দৃঢ়প্রত্যয়, গগনচুম্বী আত্মবিশ্বাস, মনোবল, অসমসাহসিকতা ও দেশপ্রেমী মনোভাবের কাছে ষড়যন্ত্রকারীদের নীলনকশা ব্যর্থ হতে চলেছে—এমন সম্ভাবনা দেখা দিলে বাঙালিকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য বাংলার বুদ্ধিজীবী, জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের হত্যায় মেতে ওঠে পিশাচরা। বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করে দিতে চালায় ভয়ংকর কিলিং মিশন। কিন্তু আত্মবিশ্বাস, ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম, দেশপ্রেম থাকলে একটি জাতি যে খুব সহজেই ঘুরে দাঁড়াতে পারে, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, দুর্মর বাংলা তা প্রমাণ করে দেয়।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে হেনরি কিসিঞ্জার তলাবিহীন ঝুড়ি বলে আখ্যায়িত করলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বাঙালিরা মিথ্যার আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে দেয় তার ভবিষ্যদ্বাণীকে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দক্ষ দিকনির্দেশনায় অতি অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের ঝুলিতে জমা হয় বড় বড় অর্জন।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীকে তুচ্ছ করে দিয়ে বিজয় ছিনিয়ে এনে বাঙালিরা তাক লাগিয়ে দেয় বিশ্ববাসীকে। বিশ্বমানচিত্রে অবস্থান করে নেয় পাকাপোক্তভাবে। বিশ্ব-আকাশে ওড়ায় লাল সবুজের পতাকা। ২০২২ সালে বিশ্ববাসীকে আরো একবার তাক লাগিয়ে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিয়েছে বীর বাঙালি। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে গড়েছে বিশ্ব রেকর্ড। প্রমাণ করে দিয়েছে বাঙালিরা চাইলে সব পারে।

মনে রাখতে হবে, একদিকে শতবছরের শোষণ-বঞ্চনা, অন্যদিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পৈশাচিক তাণ্ডবলীলায় বিধ্বস্ত বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল শূন্য হাতে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্নির্মাণ করে সামনে এগোতে পাড়ি দিতে হয়েছিল বেশ দুর্গম পথ। সেই ক্রান্তিলগ্নে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সহযোগিতা অস্বীকার করার উপায় নেই। শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া থেকে শুরু করে অস্ত্র সরঞ্জামাদি সরবরাহ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়াসহ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়েও সাহায্যের হাত বাড়ায় দেশটি। আজকের বাংলাদেশের সার্বিক চিত্রের দিকে তাকালে সেই ভয়ংকর অবস্থার আন্দাজ করা মুশকিল। অবকাঠামোগত দিক থেকে শুরু করে সামাজিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—সব ক্ষেত্রেই দেশ অর্জন করেছে ঈর্ষণীয় অগ্রগতি।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে ডিসেম্বর মাস আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমাদের এ দেশ, এ স্বাধীনতা—স্মরণ করিয়ে দেয় সেই অগ্রসেনাদের। প্রতিটি ডিসেম্বরই আমরা পিছু ফিরে তাকালে অবাক হয়ে যাই নিজেদের সফলতা দেখে। এ ডিসেম্বরেও থাকছে চমক। মেট্রোরেল চালু হয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন মাইলফলক। যদিও এই চিত্রের বিপরীতেও কিছু মন খারাপ করা চিত্র রয়েছে—সেটা স্বাভাবিক বইকি। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা পরিস্থিতি বিরাজ করায় প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশেও।

টিসিবির গাড়িতে দীর্ঘ লাইন আর বাজারে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পর্যায়ের ক্রেতাদের খালি ব্যাগ ও কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখলে তা বেশ স্পষ্টই বোঝা যায়! এসব সমস্যা সমাধানে এই মুহূর্তে আমাদের সামাজিক উন্নয়নে বেশি জোর দেওয়া জরুরি। অন্যদিকে গুটিকতক নীতিহীন, বিবেকবর্জিত মানুষের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার বিশ্বের বুকে আমাদের সুনাম-অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। স্বাধীনতার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে এসব নেতিবাচক দিক আমলে নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। যে আদর্শ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে আপামর বাঙালি, যে বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে লাখ লাখ বাঙালি আত্মাহুতি দিয়েছে, আমরা সেই পথে এগোচ্ছি কি না সেদিকে সব সময় লক্ষ রাখতে হবে। আসছে ডিসেম্বরে আরো সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার প্রতীক্ষায় বাংলার মানুষ।

লেখক:
ইসরাত জাহান নিঝুম
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here