‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি শেখ মুজিবুর রহমান নামের অবিচ্ছেদ্য অংশ-শরীফুল্লাহ মুক্তি

0
404
‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি শেখ মুজিবুর রহমান নামের অবিচ্ছেদ্য অংশ-শরীফুল্লাহ মুক্তি

শেখ মুজিবুর রহমান জনতার অভিষেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ হওয়ার আগ পর্যন্ত অনেকেই তাঁকে মুজিব ভাই বা শেখ সাহেব বলে সম্বোধন করতেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এটা ছিল প্রাসঙ্গিক। বঙ্গবন্ধু নিজেও এ সম্বোধনে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। কিন্তু সত্তরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ভূমিধস বিজয় অর্জনের পর তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালির আশা-আকাক্সক্ষার একমাত্র মূর্ত প্রতীক। পরে রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জন-সমাবেশে তোফায়েল আহম্মেদ ব্যাপক গণমানুষের মুহুর্মুহু স্লোগান ও করতালির মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ অভিধায় ভুষিত করেন। কিন্তু এখনও অনেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুজিব ভাই বা শেখ সাহেব বলে সম্বোধন করে থাকেন- যেমন করে সাধারণত অন্য যে কোনো সাধারণ ব্যক্তিকে সম্বোধন করা হয়। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।

ভারতের কোনো নাগরিক কি মহাত্মা গান্ধীকে ‘গান্ধী বাবু’ বলে বা পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুকে ‘জওহরলাল বাবু’ সম্বোধন করবেন- তা তিনি যে মতাবলম্বীর হোন না কেন! নেতাজী সুভাষ বসুকে কি কেউ ‘সুভাষ বাবু’ বলে সম্বোধন করেন? করেন না। যদি কেউ করেনও তাহলে তার মধ্যে আত্মম্ভরিতা অসীম। পাকিস্তানের নাগরিকরা জিন্নাহ সাহেবকে ‘কায়েদে আজম’ ও লিয়াকত আলীকে ‘কায়েদে মিল্লাত’ বলতে অহংকার বোধ করে। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধ’ু বা ‘জাতির পিতা’ বলতে আমাদের এত আপত্তি কোথায়? সমকক্ষ বা সমসাময়িক হলে সেটা অন্য কথা। যেমন- জিন্নাহ সাহেব সবসময় মহাত্মা গান্ধীকে মি. গান্ধী বলে ডাকতেন। জিন্নাহ সাহেব গান্ধীজির সমসাময়িক ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। তাঁর পক্ষে মি. গান্ধী বলার অর্থ অন্যরকম। এ ডাকের মধ্যে সমকক্ষতা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের একজন বাঙালির মুখে বঙ্গবন্ধুকে মুজিব ভাই বা শেখ সাহেব সম্বোধনের মধ্যে একটা অর্বাচীনতার ভাব বা স্পর্ধা থাকে। কারণ কোনো বাঙালি বঙ্গবন্ধুর সমকক্ষ নন। যারা এরকম বলেন তারা বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা বলে মানতে নারাজ বা বাংলাদেশের স্থপতি বলে স্বীকার করতে দ্বিধান্বিত।

সকল অর্থেই বাংলাদেশের আরেক নাম ‘বঙ্গবন্ধু’। তিনিই বাংলাদেশ। তিনি এই দূর্ভাগা দেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলেই আজ আমরা স্বাধীনতার স্বাদ ভোগ করতে পারছি। যত দুঃখ থাক, যত হতাশা থাক তবুও আমরা মুক্তিযুদ্ধের ফসল একটি অনন্য স্বাধীন দেশের মাথা উঁচু করা নাগরিক। ফিলিস্তিনি দুঃখী মানুষগুলোর দিকে তাকালে আমরা বুঝতে পারি আমরা কতটা ভাগ্যবান। আর এই সৌভাগ্যের স্বর্ণদুয়ারের চাবিটি ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে। এই চাবি একদিনেই আসেনি। শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠা এক দীর্ঘপথ। সেখান থেকে জাতির পিতা হওয়ার পথের দুরত্বও কম নয়। এই সুদীর্ঘ পথ তিনি হেঁটেছেন দারুণ এক প্রত্যয় ও সাহস নিয়ে।

নিজে যেমন সাহসী ছিলেন, পুরো জাতিকেও তিনি তেমনি সাহসী করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। একজন বীরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো সাহস ও নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা। বাঙালি এই শ্রেষ্ঠ বীরের সাহস ছিল সীমাহীন আর নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা ছিল তুলনাহীন। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি তাঁর সর্বোচ্চ সাহস দেখিয়েছেন। তাঁর এই সাহসের ভিত্তি ছিল জনগণের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। আর এই ভালোবাসার উৎসের একদিকে যেমন ছিল তাঁর নিরঙ্কুশ দেশপ্রেম, তেমনি অন্যদিকে তাঁর প্রতি জনগণের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা ও জনগণের অগাধ বিশ্বাস। একটি জাতি গড়ে তোলার পেছনে এই বিশ্বাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক সময়ের পূর্ব বাংলা, আজকের বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের দুঃখ মোচনের জন্য তিনি কতই-না কষ্ট, কতই-না জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। নিজের সংসার-সন্তানদের কথা না ভেবে দেশের দুঃখী মানুষের কথা অন্তর দিয়ে ভেবেছেন।

পাকিস্তানের সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে যে অবিচার, অন্যায্যতা ও বৈষম্য বিরাজ করছিল তা অবসানের জন্য তিনি ছাত্রজীবন থেকে আজীবন সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। এই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে তাঁর বিশাল এক দেশপ্রেমিকের ভাবমূর্তি। আর সে কারণেই ষাটের দশকের উত্তাল এক সময়ে তিনি শেখ মুজিবুর রহমান থেকে হয়ে ওঠেন ‘বঙ্গবন্ধু’। আবার মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিপরীক্ষার শেষে এই বঙ্গবন্ধুই জাতির পিতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

সমগ্র জীবনব্যাপী বঙ্গবন্ধুর একটিই ব্রত ছিল – বাংলা ও বাঙালির মুক্তির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা। এর শুরু ১৯৪৮ সাল থেকে। ১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, এই রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে আমরা বাঙালিরা নির্যাতিত নিস্পেষিত হব। তাই এ থেকে জনগণের মুক্তির জন্য তিনি বেছে নিয়েছিলেন আন্দোলন-সংগ্রামের পথ। ১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারির মহান ভাষা-আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৫৬ এর শাসনতন্ত্রের জন্য আন্দোলন, ’৬২ এর ১৭ সেপ্টেম্বরের শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৩ এর রবীন্দ্র চর্চা আন্দোলন, ’৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়- প্রতিটি ক্ষেত্রেই বঙ্গবন্ধুর ছিল একচ্ছত্র নেতৃত্ব। মুক্তিদূত শেখ মুজিব ১৯৭১ সালে হাজার বছরের শৃঙ্খলিত বাঙালি জাতির শৃঙ্খল টুটে দিয়ে বাঙালি জাতিকে মুক্ত করে দিয়েছেন এবং তাদের ভালোবাসার জন্য বিশ্বের বুকে ‘বাংলাদেশ’ নামে একটি স্বাধীন সার্বভৌম একটি উপহার দিয়েছেন, যেখানে গত ৬০ বছর যুদ্ধরত ফিলিস্তিনিদের ও কাশ্মীরিদের একটি স্বাধীন দেশ হয়নি।

১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তিসনদ ছয়দফা আন্দোলন ঘোষণার পর যে দুর্বাব গণআন্দোলন গড়ে ওঠে তার একচ্ছত্র নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ছয়দফা দেওয়ার পর শেখ মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে জেনারেল আইয়ুব খান তথাকথিত ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করেন। তাঁর মুক্তির দাবিতে বাংলার ছাত্র-জনতা গণঅভ্যুত্থান ঘটায়।

উনসত্তরের গণআন্দোলন সফল হয়। আগারতলা ষড়যন্ত্র মামলার এক নম্বর আসামি শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তান সরকার মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। তখন তিনি শুধু একটি দলের নয়, সারা জাতির নেতা হয়ে ওঠেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ রমনা রেসকোর্সে শেখ মুজিবুর রহমানকে গণসংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন করা হয়। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সভা আহবান করা হয়। সেই সভায়, সভার সভাপতি সেই সময়ের ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। মানুষ হাততালি দিয়ে তা সমর্থন করে। বঙ্গবন্ধু মানে বাংলার বন্ধু। পরদিন ২৪ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকে সেই দিনের সভার একটি বিবরণ ছাপা হয়েছিলো।

রিপোর্টটি ছিল এরকম- ‘কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ও গতকল্যকার গণসংবর্ধনা সভার সভাপতি জনাব তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলা ও বাঙালির স্বার্থে অবিচল অবিরাম সংগ্রামের কথা স্মরণ করাইয়া দিয়া ঢাকার ইতিহাসে সর্বকালের সর্ববৃহৎ সমাবেশের উদ্দেশ্যে বলেন যে, ‘‘আমরা বক্তৃতা-বিবৃতিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে নানা বিশেষণে বিশেষিত কারার প্রয়াস পাই। কিন্তু তাঁহার রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করলে যে সত্যটি সবচাইতে ভাস্বর হইয়া উঠে, তাহা হইতেছে তিনি মানবদরদী, বিশেষ করিয়া বাংলা ও বাঙালি দরদী, প্রকৃত বন্ধু। তাই আজকের এই ঐতিহাসিক জনসমুদ্রের পক্ষ হইতে আমরা তাঁহকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করতে চাই।’’ সেই থেকেই শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির কাছে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন।

সেই দিনটির স্মৃতিচারণ করে তোফায়েল আহম্মেদ বলেছেন, ‘সেদিন আমরা কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে ১০ লক্ষাধিক লোকের সামনে তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করি। … আমি সভাপতির ভাষণে বাঙালি জাতিকে জিজ্ঞাস করেছিলাম যে, আমরা জাতির পক্ষ থেকে নেতাকে একটি উপাধি দিতে চাই। তখন ১০ লক্ষাধিক লোক ২০ লক্ষাধিক হাত তুলে আমাকে অনুমতি দিয়েছিলেন।’ (দ্র. বিচিত্রা, ২৫ বর্ষ ১৩ সংখ্যা, ১৬ আগস্ট ১৯৯৬/ ১ ভাদ্র ১৪০৩, পৃষ্টা ৪৫)।

১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারির সে দিনের সে সভায় ভাষণদানকালে শেখ মুজিব বলেন, ‘‘ আমি সরকারের সাথে প্রস্তাবিত রাজনৈতিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করে দেশের উভয় অংশের পক্ষ থেকে দেশবাসীর অধিকারের দাবি উত্থাপন করব। উত্থাপিত দাবি যদি গ্রাহ্য করা না হয় তবে সে বৈঠক থেকে ফিরে এসে দাবি আদায়ের জন্য আমি দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলব।… সংগ্রাম করে আমি আবার কারাগারে যাব, কিন্তু মানুষের প্রেম-ভালোবাসার ডালি মাথায় নিয়ে দেশবাসীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারবো না। বঞ্চিত বাঙালি, সিন্ধি, পাঞ্জাবি, পাঠান আর বেলুচের মধ্যে কোনো তফাত নেই। কায়েমি স্বার্থবাদীদের শোষণ থেকে দেশের উভয় অংশের জনগণের মুক্তির একমাত্র পথ হলো আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও অর্থনৈতিক আজাদী। আমি আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন চাই, প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত সার্বভৌম পার্লামেন্ট চাই এবং রাজনীতি, অর্থনীতি, চাকরি-বাকরি অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্ব পর্যায়ে জনসংখ্যার অনুপাতে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব চাই। আমি শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি চাই। কৃষকের উৎপন্ন দ্রব্যের মূল্য চাই। সাংবাদিকদের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চাই।’ (দ্র. দৈনিক ইত্তেফাক, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯)

সাম্প্রদায়িকতামুক্ত ও প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন রাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধ্যান। সে লক্ষ্য পুরণে তিনি সমসাময়িক সব নেতাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, ‘রাজনীতিতে তিনি ছিলেন এক মহাকাব্যের নায়ক। সেই মহাকাব্য হচ্ছে পাকিস্তান রাষ্ট্র-কাঠামোর মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং পরিণতিতে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। (দ্র. বিচিত্রা, ২৫ বর্ষ ১৩ সংখ্যা, ১৬ আগস্ট ১৯৯৬/ ১ ভাদ্র ১৪০৩, পৃষ্টা ৩৮-৩৯)।

৭ মার্চ ১৯৭১ সালে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণের জন্য তিনি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন। ২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার কারণে তাঁকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি অবস্থায় গোপন সামরিক বিচারে মৃত্যুদণ্ডের রায়ও হয়েছিল। কিন্তু তিনি এসব পরোয়া করেননি। ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকার গঠন করা হলে তিনি বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে তাঁর নামে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। এই সময় মুক্তিযোদ্ধাসহ জনগণের কণ্ঠ থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের সঙ্গে সঙ্গে ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানও ধ্বনিত হতে থাকে।

স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে বাঙালি জাতির পিতা হিসেবেও বিভিন্ন সংবাদ-মাধ্যমে প্রচার করা হতে থাকে। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে এক বিশাল জনসভায় আ স ম আব্দুর রব বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সময় থেকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে তাঁর নাম সর্বস্তরের জনগণ এবং সকল মহলে ব্যাপকভাবে উচ্চারিত হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে জাতির পিতা হিসেবে তাঁকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয়। ভারতের গান্ধীজী, সোভিয়েত ইউনিয়নের লেলিন, আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, আমেরিকার আব্রাহাম লিংকন এর মতো বাঙালি জাতির ‘জাতির পিতা’ উপাধিটা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরই প্রাপ্য এতে কারো কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সেই দেশের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি কে, তার জরিপ করে থাকে। বিবিসি শ্রোতাদের কাছে জানতে চেয়েছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি কে? অনেকেরই নাম এসেছিল। কিন্তু শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে এসেছেন বাঙালির স্বাধীনতা যিনি এনেছেন তাঁর নাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে ২০১৭ সালে অক্টোবর মাসের শেষের দিকে ইউনেস্কো ‘ডকুমেন্টারী হেরিটেজ’ বা বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তীকালে বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার মহানায়ককে জাতিসংঘও ‘ফেন্ড অব দ্যা ওয়াল্ড’ বা ‘বিশ্ববন্ধু’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বঙ্গবন্ধুর ৪৪ তম শাহাদত বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধুকে এ আখ্যা দেয়া হয়। কাজেই ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ’ এই আসনের দাবিদার বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কেউ হতে পারে না।

আবুল কাশেম ফজলুল হক বা চিত্তরঞ্জন দাশ বা সুভাষ বসু নামক অনেক ব্যক্তি আছেন এই বাংলায়। কিন্তু শেরে-বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক বা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস বা নেতাজী সুভাষ বসু বলতে আমরা একজনকেই বুঝি। ‘শেরে-বাংলা’/‘দেশবন্ধু’/‘নেতাজী’ শব্দগুলো তাঁদের নামের পূর্বে অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। তাঁদের নামের পূর্বে এই শব্দগুলো না বসালে বা উচ্চারণ না করলে কেমন জানি অসম্পূর্ণ বা বেমানন মনে হয়, পাশাপাশি যথাযথ শ্রদ্ধার ঘাটতিও। তেমনি শেখ মুজিবুর রহমানের নামের পূর্বে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটিও এখন অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। তাই জাতির জনকের নাম উচ্চারণের পূর্বে আমাদের অবশ্যই যথাযথ সম্মানের সাথে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি ব্যবহার করা উচিত। রাজনৈতিক ভিন্ন মত থাকতে পারে, কিন্তু যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য সম্মান দিতে কার্পণ্যবোধ করা উচিত নয়।

লেখক: শরীফুল্লাহ মুক্তি,
প্রাবন্ধিক, শিক্ষা-গবেষক ও ইন্সট্রাক্টর,
উপজেলা রিসোর্স সেন্টার, বারহাট্টা, নেত্রকোনা।

শরীফুল্লাহ মুক্তি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here