জেনে নিন কেন করা হয় ৩১ বার তোপধ্বনি

0
80
জেনে নিন কেন করা হয় ৩১ বার তোপধ্বনি

জেনে নিন কেন করা হয় ৩১ বার তোপধ্বনি। তোপধ্বনি হচ্ছে প্রচলিত সামরিক সম্মান। এটা ঐতিহ্যগতভাবেই এসেছে। বাংলাদেশে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দেশের সূর্যসন্তানদের সম্মান জানানো হয়।

বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বা বিশেষ দিবসকে তোপধ্বনির (কামান দাগা) মাধ্যমে সম্মান জানানো একটি প্রচলিত রীতি। ঐতিহাসিকভাবে এভাবে সম্মান জানানোর প্রথা অনুসরণ করে সামরিক বাহিনী। সামরিক অভিবাদনের এই প্রথাটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত। এক্ষেত্রে সংখ্যার বিষয়টিও এসেছে ঐতিহাসিকভাবে। ব্যক্তি বা ক্ষেত্রবিশেষে তোপধ্বনির সংখ্যা কম-বেশি হয়ে থাকে।

আমাদের দেশেও স্বাধীনতা এবং বিজয় দিবসে তোপধ্বনির মাধ্যমে শ্রদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক অভিবাদন জানানো হয়। দু’টি দিনেই ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে সম্মান জানানো হয়। আবার বাংলাদেশে অন্য কোনও দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান বা আন্তর্জাতিক বিশিষ্ট কোনও ব্যক্তিকে শ্রদ্ধা জানাতে ২১ বার তোপধ্বনি করা হয়। বিশ্বব্যাপী সামরিক সম্মান জানাতে ২১ বারই তোপধ্বনি করার বিষয়টি জানা যায়।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, তোপধ্বনির মাধ্যমে সম্মান বা অভিবাদনের রীতি শুরু হয়েছিল চতুর্দশ শতকে। তখনকার সময়ে নৌবিদ্যায় পারদর্শীরাই পৃথিবীজুড়ে রাজত্ব করতো। সড়ক পথ কম থাকায় অধিকাংশ যুদ্ধই হতো নৌ-পথে। কোনও যুদ্ধজাহাজে গোলাবারুদ শেষ হয়ে গেলে রিলোড করার আগ পর্যন্ত সেটি অসহায় থাকত। এমন পরিস্থিতিতে জাহাজটি স্থলভাগের সৈনিকদের কামানের গোলার মাধ্যমে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ইঙ্গিত দিতো। তাই বিদেশের বন্দরে কোনও যুদ্ধজাহাজ প্রবেশ করলে এভাবেই তোপধ্বনি দিয়ে তারা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককেই সম্মান জানায়।

আবার ওই সময় কোনও জাহাজ যখন যুদ্ধের জন্য বন্দর ছেড়ে যেতো তখন স্থলভাগ ও জাহাজের ভেতর দুই স্থান মিলিয়ে মোট ২১ বার তোপধ্বনি দেওয়া হতো। পরবর্তীতে এই ২১ বারের তোপধ্বনির বিষয়টি একটি চুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়। যা বর্তমানে পুরো পৃথিবীতে প্রচলিত।

৩১ বার তোপধ্বনির কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, বিশ্বের অন্যান্য দেশে ২১ বার তোপধ্বনি প্রচলন থাকলেও তৎকালীন ব্রিটিশ উপনিবেশিক দেশগুলো এই নিয়মে কিছুটা পরিবর্তন এনে ৩১ বার নির্ধারণ করে। বিষয়টি এমন যে, যখন কোনও যুদ্ধজাহাজ বন্দর বা ঘাঁটি ছেড়ে বের হয় তখন সেই জাহাজ থেকে ৭ বার তোপধ্বনি দেওয়া হয়।

ঘাঁটিতে বা বন্দরে অর্থাৎ মাটিতে সৈনিকদের যে দল বা ব্যাটালিয়ন থাকে তারাও সেই তোপধ্বনির জবাবে ২১ বার তোপধ্বনি দিয়ে সম্মান জানায়। জাহাজ থেকে ৭ বার, মাটি থেকে ২১ বার মোট ২৮ বার তোপধ্বনি করার পর জাহাজ থেকে আরও তিনবার তোপধ্বনি করা হয়। সেই অতিরিক্ত তিনটি তোপধ্বনির একটা করা হয় ব্রিটিশ রাজা বা রাণীর সম্মানে, অন্যটা জাহাজের ক্যাপ্টেনের জন্য এবং শেষটা হচ্ছে ব্রিটিশ বাহিনীর রাজকীয় প্রতিনিধির জন্য।

তবে জাহাজ ছেড়ে যাওয়া কিংবা যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ছাড়াও ব্রিটিশ ক্রাউন ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলের রাজা বা তার প্রতিনিধিদের শ্রদ্ধা জানাতে তোপধ্বনি প্রথা চালু হয়েছিল। ইতিহাস থেকে দেখা যায়- রাজা, নবাব বা জমিদারদের গুরুত্বভেদে এই তোপধ্বনি নির্ধারণ করা হতো। কোনও কোনও নবাব বা জমিদারের জন্য কোনও তোপধ্বনি বরাদ্দ ছিল না। একমাত্র বড়লাটই নির্বাচন করতেন কোন রাজার সম্মানে কতগুলো তোপ দাগা হবে।

রাজ্যের সমৃদ্ধি, রাজরক্তের কৌলীন্য আর সর্বোপরি ব্রিটিশরাজের প্রতি তাদের আনুগত্যবোধ থেকে তোপধ্বনির সংখ্যা নির্ধারণ হতো। তিনিই তোপধ্বনির সংখ্যা বাড়াতে বা কমাতে পারতেন। যেমন, হায়দ্রাবাদ, কাশ্মির, গোয়ালিয়র, মহিশুর এবং বারোদার রাজার বরাদ্দ ছিল ২১ বার তোপধ্বনির সম্মান। এর ধারাবাহিকতায় কেউ পেত ১৯, কেউ ১৭, কেউ ১৫ কিংবা ৯টি তোপের আখ্যা। আবার কারও কারও ক্ষেত্রে কোনও তোপধ্বনি বরাদ্দই ছিলো না।

এ বিষয়ে মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক বলেন, তোপধ্বনি হচ্ছে প্রচলিত সামরিক সম্মান। এটা ঐতিহ্যগতভাবেই এসেছে। বাংলাদেশে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দেশের সূর্যসন্তানদের সম্মান জানানো হয়। তবে, এই সম্মানের সঙ্গে তোপধ্বনির সংখ্যার সেই অর্থে কোনও সম্পর্ক নেই। কোথাও ৭ বার, কোথাও ২১ বার আবার ৩১ বারও এই তোপধ্বনি হয়।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর)-এর পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদ জানান, এটি সামরিক সম্মান। নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ঘাঁটি ছেড়ে যাওয়ার সময় এই তোপধ্বনির রেওয়াজ শুরু হয়। এটি কখনও ২১ বার আবার কখনও ৩১ বার হয়ে থাকে। আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এই তোপধ্বনির মাধ্যমে স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে সম্মান জানানো হয়। আর যতদূর জানি, ৩১ বার তোপধ্বনির বিষয়টি ব্রিটিশ রেওয়াজ থেকে এসেছে।

সামরিক অভিবাদন ও ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা যায় ৩১বার তোপধ্বনির অর্থ হল, প্রতীকী সম্মান বা স্মরণ। এর আরেকটি অর্থ হল, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে সম্মান প্রদর্শন করা ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসের শুরুতে ৩১ বার তোপধ্বনি দেওয়া হয় মূলত জাতির সূর্য সন্তান যারা ভোর এনে দিয়েছিল , যাদের রক্তের অক্ষরে লেখা হয়েছে বাংলাদেশের নাম, তাঁদের প্রতি সর্বাগ্রে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন ও স্মরণ করতে, তাঁদের ত্যাগের কথা যে আমরা ভুলিনি তা জানাতে। এটিকে জাতির বীর সন্তানদের প্রতি সামরিক অভিবাদনও বলা যেতে পারে।

চলুন দেখে নিই ৩১ বার তোপধ্বনি ইতিহাস:

১. তোপধ্বনি দেয়ার রীতিটা নৌবাহিনী থেকেই আসছে। মূলরীতি কিন্তু ২১ বারই দেয়া। তবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দেশগুলো এই নিয়মটা কিছুটা পরিবর্তন করে ৩১ বারে আনা হইছে। বিষয়টা হচ্ছে এমন যে, যখন কোন যুদ্ধ জাহাজ বন্দর বা ঘাঁটি ছেড়ে বের হয় তখন সেই জাহাজ থেকে ৭ বার তোপধ্বনি দেয়া হয়।

ঘাঁটিতে বা বন্দরে অর্থাৎ মাটিতে সৈনিকদের যে দল বা ব্যাটারি থাকে তারাও সেই তোপধ্বনি জবাবে ২১ বার তোপধ্বনি করে সম্মান প্রদর্শন করে। জাহাজ থেকে ৭ বার, মাটি থেকে ২১ বার মোট ২৮ বার তোপধ্বনি করার পর জাহাজ থেকে আরো ৩বার তোপধ্বনি করা হয়। সেই অতিরিক্ত তিনটা তোপধ্বনির একটা করা হয় ব্রিটিশ রাজা বা রানীর সম্মানে, অন্যটা জাহাজের ক্যাপ্টেনের জন্য এবং শেষটা হচ্ছে ব্রিটিশ বাহিনীর রাজকীয় প্রতিনিধির জন্য।

এই তোপধ্বনির দেয়ার রীতিটা শুরুটা হয়েছিল ১৬শ শতকের শেষের দিকে আর প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল সতেশ শতকের প্রথম দিকে। তখনকার সময়ে নৌ বিদ্যায় যারা পারদর্শি ছিল তারাই পৃথিবী বেশি রাজত্ব করত। ফলে অধিকাংশ যুদ্ধই হতো নৌ পথে। এই রীতিতে বুঝানো হয়, যখন কোন যুদ্ধ জাহাজ তার সকল গোলাবারুদ শেষ করে ফেলে নতুন করে আবার রিলোর্ড করা পর্যন্ত সে অসহায় থাকে, তখন তার আর পরাজিতদের মাঝে কোন পার্থক্য থাকে না। এই অবস্থায় জাহাজটি যখন স্থলভাগের সৈনিকদের কামানের গোলার আওতায় খালি হাতে থাকে তখন তা একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কেরও ইংগিতও দেয়। তাই বিদেশের বন্দরে যখন কোন যুদ্ধ জাহাজ প্রবেশ করে তখন এইভাবে তোপধ্বনি করে তারা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কেই সম্মান প্রদর্শন করে।

২. আস্তিক বা নাস্তিক, হিন্দু বা মুসলমান, ধনী বা নিধন কিংবা পূণ্যাত্মা বা পাপাচারী যে যেমনই হোক, কয়েকশ বছর ধরে এইসব রাজারাই ব্রিটিশ শাসনের নিশ্চিত স্তম্ভ ছিল। এদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই ইংরেজরা এদেশে ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ নীতিতে শাসন কাজ চালিয়ে গেছে। জায়গিরভোগী এইসব গোলামদের (রাজাদের) কাকে কতখানি সম্মান দেয়া হবে তা নির্ধারণ করার একটা অদ্ভুত পদ্ধতি আবিস্কার করেছিল ব্রিটিশ ক্রাউন। এই মাপকাঠিটা হলো রাজাদের সম্মানে তোপধ্বনির সংখ্যা।

রাজতন্ত্রের কাঠামোতে কোন রাজার স্থান কোথায় হওয়া উচিত তা নির্ণয় করতো এই তোপধ্বনি। একমাত্র বড়লাট বাহাদুরই নির্বাচন করতেন কোন রাজার সম্মানে কতগুলি তোপদাগা হবে। রাজ্যের আয়তন বা জনসংখ্যা এর বিচারের মাপকাঠি ছিল না। বড়লাটবাহাদুর বিচার করতেন রাজ্যের সমৃদ্ধি, রাজরক্তের কৌলিণ্য আর সর্বোপরি ব্রিটিশরাজের প্রতি তাদের আনুগত্যবোধ। তিনিই পারতেন তোপধ্বনির সংখ্যা বাড়াতে বা কমাতে।

পাঁচটি প্রধান জায়গিরভোগি রাজা যেমন,হায়দ্রাবাদ, কাশ্মির, গোয়ালিয়র, মহিশুর এবং বারোদার বরাদ্ধ ছিল ৩১ বার তোপধ্বনির সম্মান। ক্রমানুসারে কেউ পেত ১৯, কেউ পেত ১৭, কেউ ১৫ কিংবা ৯টি তোপের আখ্যা। তবে মোট ৪২৫ জন রাজা, নবাব বা জমিদারের কপালে একটা তোপধ্বনিও বরাদ্দ ছিলনা। বলতে গেলে এইসব হতভাগ্য ভুস্বামীরা প্রায় বিস্মৃতই ছিল। ব্রিটিশ ক্রাউনের নেকনজর কোনদিনই পায়নি তারা। তাদের সম্মানে কোনোদিন একটি তোপও দাগা হয়নি। তোপধ্বনির আদি ইতিহাস এটাই বা ৩১ বার তোপধ্বনির উৎপত্তির ইতিহাস এটাই।

দু:খজনক হল, এই অর্থহীন উপনিবেশিক গোলামী রীতি ৩১ তোপধ্বনি এখনো এই দেশে চালু আছে। এটার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

সূত্র : ‘ফ্রিডম এ্যাট মিডনাইট’ লেখক : ল্যারি কলিন্স এবং দোমিনিক লাপিয়র।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here