আমাদের বাকস্বাধীনতা কোথায়?

0
16
আমাদের বাকস্বাধীনতা কোথায়?

আমাদের বাকস্বাধীনতা কোথায়? ১৯৭১ সালের নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্ম নেয়। এই তো সেদিন দেশটির স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎযাপন করলাম আমরা। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক আমি এবং আমরা, ভাবতেই মনটা ফুরফুরে হয়ে যায়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় কি জানেন?

আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক ঠিকে কিন্তু আমাদের বাকস্বাধীনতা প্রায় শেকল বন্ধি হতে যাচ্ছে। বাকস্বাধীনতা অর্থাৎ মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা যেন যুদ্ধে যাওয়ার মতো হয়ে গেছে। আর সেটা যদি হয় কোন ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ তবে পরাজয় নিশ্চিত।

রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের রাষ্ট্র যেহেতু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সেখানে নিজেস্ব মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যে আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে পাই তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। রাষ্ট্র পরিচালকদের ভালো দিক খারাপ দিক উভয় থাকে এটা মানি কিন্তু সেই খারাপ দিকটার কথা তুলে ধরার স্বাধীনতাটা আমরা হারাতে বসেছি। সেদিক থেকে বলতে হয় আমাদের রাষ্ট্র গণতন্ত্র হারাতে বসেছে।

দেশের রাজনৈতিক চর্চা, গণতান্ত্রিক অধিকার, নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা আছে আর থাকবে এটা স্বাভাবিক। কারণ সবার মতামত এক কখনোই হবে না। তাই দ্বিমত থাকবে, থাকবে বিরোধীতা। আর সেটা মেনে নিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে, সমাধানে আসতে হবে। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র সেই দ্বিমতটাকে মেনে নিতে পারছে না। তাই যেই আমাদের রাষ্ট্রীয় দলের বিরুদ্ধে কথা বলতে আসবে তাকেই চরম খেসারত দিতে হবে। যা সকলের জানা। অথচ গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মানবাধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, কথা বলার অধিকার ও দ্বিমত পোষণের সুযোগ। এর সব কটি সূচকে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের পতন হচ্ছে।

জীবনের নিরাপত্তাহীনতা, যখন-তখন যাকে খুশি তাকে দিনদুপুরে প্রকাশ্যে পিটিয়ে মেরে ফেলা, বিভিন্ন বক্তব্যের জন্য আটক করা, গুম ও বিনা বিচারে হত্যা জনমনে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে। ফলে কেউ সত্যটাকে সত্য বলতে এগিয়ে আসতে পারছে না। যা একটি গণতান্ত্রিক দেশের বিপরীত পক্ষে চলছে। এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে যেখানে ক্ষমতাসীন দলীয়দের তেল মেরে চলতে পারলেই জীবন সুন্দর। আর এরকম সুযোগটাকেই অনেকেই নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে সুখের প্রাসাদ গড়ছে। দেখার কেউ নেই বলার কেউ নেই। গণমাধ্যমগুলোও এগুলোর বিরুদ্ধে লিখতে পারবে না। কারণ এসব বলতে গেলেই খেসারত হিসেবে প্রাণও যেতে পারে। কে চায় দিন দুপুরে প্রকাশ্যে নিজের প্রাণ অন্যের হাতে তুলে দিতে?

একে তো মতামত প্রকাশে প্রাণ নাশের ভয় আছে তার উপর আছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৬ মাসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ৮৯০টি মামলা হয়। প্রথম ১৫ মাসে গড়ে ৬০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

পরবর্তী ৯ মাসে গড়ে ১৪৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। আর একক গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় হিসেবে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেই বেশি মামলা হয়েছে। জরিপে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ ১৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ মামলা হয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে, রাজনৈতিক নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে ১৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ, শিক্ষার্থীদের ২ দশমিক ৯১ শতাংশ, শিক্ষক ২ দশমিক ৯১ শতাংশ, বেসরকারি চাকরিজীবী ২ দশমিক ১৮ শতাংশ, ব্যবসায়ী ২ দশমিক ১৮ শতাংশ, সরকারি চাকরিজীবী ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ ও আইনজীবী শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ।

সর্বোচ্চ মামলা হয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। যার ফলে আমাদের দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোও স্বাধীন নয়। সরকার, রাষ্ট্র, রাজনীতি, ক্ষমতার বলে করা দুর্নীতি এসব নিয়ে মতামত লিখলেও অনেক পত্রিকা সেগুলো ছাপাতেও চায় না। তাই বলতেই হয় আমাদের বাকস্বাধীনতা ঠিক কোথায়? অমর্ত্য সেন বলেছিলেন, বাকস্বাধীনতা প্রকৃতপক্ষে মানব স্বাধীনতারই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যা আমরা হারাতে বসেছি।

রাষ্ট্রের প্রকৃত অবস্থা, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ক্ষমতাসীন দলের লোকদের মুখোশের আড়ালের চরিত্র ইত্যাদি সম্পর্কে সকলে অবগত হতে পারছে না কারণ আমাদের রাষ্ট্র স্বাধীন কিন্তু বাকস্বাধীনতা নেই, নেই জীবনের নিরাপত্তা। যখন-তখন যাকে তাকে মেরে ফেলা আমাদের দেশে সহজ হয়ে যাচ্ছে। প্রকৃত বিচারের আশা তো অতীত। এমতাবস্থায়, রাষ্ট্র যে গণতন্ত্র হারাতে বসেছে তা মানতেই হবে। কারণ কোনও রাষ্ট্র যদি নিজেকে গণতান্ত্রিক দাবি করে তবে সেখানে গণমাধ্যমের একশ ভাগ স্বাধীনতা থাকতে হবে, থাকতে হবে মতামত প্রকাশের অধিকার অর্থাৎ বাকস্বাধীনতা।

তবেই আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। না হলে আজকের দুর্নীতি, খুন, গুম একদিন যুদ্ধ আর হানাহানিতে পরিণত হবে। তাই গণমাধ্যম, সাংবাদিক কিংবা সাধারণ জনগণের মতপ্রকাশ অর্থাৎ বাকস্বাধীনতা দিতে হবে। কোন ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান যদি সরকার কিংবা ক্ষমতাসীন দলের সমালোচনা করে তবে তার জানের নিরাপত্তা সরকারকেই দিতে হবে। এটা গণতান্ত্রিক নীতির মধ্যেই পরে। তাই গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে সকল প্রকার মানুষের বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। মেনে নিতে হবে সকল প্রকার সমালোচনা। গণতন্ত্রের বিকাশে ভিন্নমত পোষণের পূর্ণ সুযোগ থাকতে হবে। তবেই বাকস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হবে বলে মনে করছি।

লাইজু আক্তার
শিক্ষার্থী,
নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here