মুক্তিযুদ্ধের গানের দেশ সেরা মুক্তাগাছার আদিশ্রী

0
11
মুক্তিযুদ্ধের গানের দেশসেরা প্রতিভার নাম মুক্তাগাছার আদিশ্রী

মুক্তিযুদ্ধের গানের দেশসেরা প্রতিভার নাম মুক্তাগাছার আদিশ্রী। দেশাত্মবোধক ও মুক্তিযুদ্ধের গানের দেশসেরা আবিষ্কারের উজ্জ্বল এক প্রতিভার নাম ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার আদিশ্রী সাহা।

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার নগেন্দ্র নারায়ণ পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এবছর এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন আদিশ্রী।নিজের লেখা ও সুর করা মুক্তিযুদ্ধের গান গেয়ে নিজেকে পৌঁছে দিয়েছেন সংগীতের অনন্য এক উচ্চতায়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত চলতি বছরের ২৭ মার্চ রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় সংগীত বিভাগে মাধ্যমিক স্তরে দেশসেরা নির্বাচিত হন আদিশ্রী। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভাপতি আ ক ম মোজাম্মেল হক এর হাতে থেকে দেশসেরার পুরস্কার গ্রহণ করেন তিনি। সংগীতের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসায় দেশসেরা হয়ে এপার বাংলা -ওপার বাংলার হাজারও সঙ্গীতজ্ঞের প্রশংসা কুঁড়ান আদিশ্রী সহা।

ছোটবেলা থেকেই মায়ের মুখের গান শুনে, গানের প্রতি অগাধ ভালোবাসার জন্ম নেয় তার মনে। সেখান থেকেই গানের প্রতি ধহরম-মহরম ও ভালোলাগার শুরু। প্রয়াত সীমা কুন্ডুর হাত ধরেই মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সেই সংগীতে হাতেখড়ি হয় তার।সঙ্গীতগুরু মামুনুল ইসলাম রনির সংগীতশালায় দীর্ঘ ৯ বছর তালিম নেয়ার পর থেকে আর পিছু ফিরে তাঁকাতে হয়নি তাকে।

বাবা তাপস কুমার সাহা পেশায় কলেজ শিক্ষক আর মা রিতা রাণী রায় একজন গৃহিনী। দুই ভাইবোনের মধ্যে ছোট আদিশ্রী। বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণায় লেখাপড়ার পাশাপাশি গান চালিয়ে গিয়েছেন এ তরুণ প্রতিভাবান গায়িকা। নিজের অর্জনের খাতায় একে একে যুক্ত করেছেন চারটি জাতীয় পদক।

এছাড়াও জেলা ও উপজেলার পর্যায়সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অন্তত ২০টি পুরস্কার অর্জন করেছেন তিনি। ২০১৯ সালে ‘চ্যানেল আই গানের রাজা’য় শীর্ষ ১২-তেও স্থান পান গানের পাখি আদিশ্রী সাহা।

কিভাবে নিজেকে জাতীয় পর্যায়ে আনলেন আদিশ্রীকে এমন প্রশ্ন করা হলে, উত্তর দিতে গিয়ে আদিশ্রী সাহা যুগান্তরকে বলেন, কাজটি মটেও সহজ ছিলনা। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ স্তরের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কুইজ, নৃত্য, সংগীত, চিত্রাঙ্কন এবং রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে এ সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। দেশসেরা হতে নিজেকে প্রস্তুত করে,সেখানে উপজেলা, জেলা, অঞ্চল ও বিভাগীয় পর্যায়ের ধাপ পার হয়ে দেশাত্মবোধক গান গেয়ে প্রথম স্থান অর্জন করে আমাকে জাতীয় পর্যায়ে আসতে হয়েছে।

শুধু এখানেই শেষ নয়,জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতার প্রজ্ঞাপনে শর্ত ছিল- প্রতিযোগীকে গাইতে হবে ‘মুক্তিযুদ্ধের নতুন গান’। শর্ত জানতে পেরে প্রথমে আমি একটু নার্ভাস হয়ে পড়ি। যখন জানতে পারলাম ঢাকায় গিয়ে নতুন গান গাইতে হবে তখন হাতে তেমন একটা সময় ছিলনা। আমার পরিবারের অনুপ্রেরণায় ও সঙ্গীতগুরু মামুনুল ইসলাম রনি স্যারের সাহায্য নিয়ে গানটি নতুন করে সাজালাম। আমার অবশ‍্য আগের থেকেই গান লেখা ও সুর করার একটা শখ ছিল। কিছু গান লিখে সেগুলো সুরও করতাম শখের বশেই। সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ওই গানটি নির্ধারণ করলাম। আর নিজের কাছে নিজে প্রশ্ন করলাম আমি কি পারব?

আমার ভিতর থেকে আওয়াজ আসতে থাকল। তোর সাথে তোর বাবা-মা ও গরুজনের আশীর্বাদ রয়েছে। তুই পারবি আদিশ্রী! তোকে তো পারতেই হবে! এর প্রেক্ষিতে আমি নিজেই ‘বিজয়ের দেশ আমার বাংলাদেশ’ শিরোনামের একটি মুক্তিযুদ্ধের গান লিখি এবং নিজেই সেই গানে সুর দিলাম। ওই গানই আমার জাতীয় পর্যায়ের সম্মাননা এনে দিয়েছে। আমি গুণীজনদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।

গান নিয়ে ভবিষ্যতে কর্মপরিকল্পনা প্রসঙ্গে আদিশ্রী বলেন,গান আমার জীবনে অনেক কিছুই দিয়েছে।বাকিটা জীবন দেশ ও মুক্তিযুদ্ধের গান নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই। আমি গান গেয়ে দেশের এবং দেশের বাইরের মানুষের কাছে ভালোবাসা পেতে চাই। ভালো কিছু গান সৃষ্টি করতে চাই। ভবিষ্যতে গান লেখা ও সুরের দিকে আরও মনোযোগী হতে চাই। আর হ‍্যা এটাই সত‍্য,আমার পরিবারের অনুপ্রেরণায় ও সঙ্গীতগুরু মামুনুল ইসলাম রনি স্যারের সাহায্যের হাত আমার মাথার উপরে না থাকলে,আমি আজ এ পর্যায়ে আসতে পারতামনা। তাদের ঋণ কখনোই শোধ করার মতো নয়। সর্বোপরি দেশবাসীর কাছে আশীর্বাদ চাই।

মেয়ের গান নিয়ে নিজেদের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে আদিশ্রীর বাবা তাপস কুমার সাহা এবং মা রিতা রাণী রায় যুগান্তরকে বলেন, ছোটবেলা থেকেই গান শেখার প্রতি ওর আগ্রহ ছিল প্রবল। আমি কোন গান কিংবা প্রার্থনা করলে ও আমার সাথে সাথেই গাইত। দেশ ও মুক্তিযুদ্ধের গানের প্রতি ওর একটা আলাদা আগ্রহ কাজ করত। ওর আগ্রহ দেখে আমরা অনুপ্রেরণা দিয়ে যেতাম। গান দিয়ে আদিশ্রী এলাকার নাম উজ্জ্বল করেছে। প্রার্থনা করি গান দিয়েই বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের নাম মেলে ধরুক। মুক্তাগাছার আদিশ্রী সাহা।

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার নগেন্দ্র নারায়ণ পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রী আশুতোষ সরকার বলেন, সে অনেক মেধাবী এবং অসাধারণ গান করে। ইতিমধ্যে গান গেয়ে ময়মনসিংহ মুক্তাগাছার নাম ছড়িয়েছে সে। শিক্ষা নেওয়ার প্রতি ওর যে আগ্রহ রয়েছে তার মাধ্যমে অনেক উপরে উঠবে আদিশ্রী।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ শাহাদাত হোসেন জানান, সংগীতে অবদান রাখায় জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ওর ঝুলিতে রয়েছে অনেক পুরষ্কার। ওর মেধা-মনন ওকে অনেক দূর পৌঁছে দিবে।

আদিশ্রীর প্রতিভা প্রসঙ্গে সংগীত শিক্ষক মামুনুল ইসলাম রনি বলেন, যখন ওকে আমি প্রথম দেখি তখনই ভেবেছিলাম ওর ভিতরে অনেক প্রতিভা রয়েছে।গানের প্রতি ওর মমত্ববোধ এবং ওর গলার সুমিষ্ট কণ্ঠস্বরের গান,সংগীতের মুগ্ধতা ছড়াত। যতই কন্ঠের গান শুনেছি ততই মুগ্ধ হয়েছি।

মনে মনে ভাবতাম আদিশ্রী একদিন বড়মাপের শিল্পী হবে। ভাবনার চেয়ে বেশি হয়েছে। নিজের চেষ্টাতেই সে আগামীতে আরও বড় সফলতা বয়ে আনবে বলে আমি বিশ্বাস করি। সেই সক্ষমতা তার মধ্যে রয়েছে। আমি তার আলোকিত সংগীত জীবন কামনা করি।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here